
মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের সঙ্গে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর গত এক সপ্তাহ ধরে চলা সংঘর্ষের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৪৩ জনে দাঁড়িয়েছে।
ধারবাহিকভাবে অবনিতশীল এ পরিস্থিতিকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর পরিচালিত গণহত্যা পরিস্থিতির ‘নতুন পর্যায়ের’ ইঙ্গিতবাহী বলে যুক্তরাজ্যের একদল গবেষক আশংকা প্রকাশ করেছেন।
মিয়ানমার টাইমস জানিয়েছে, গত ৯ অক্টোবর বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাখাইন প্রদেশের মুংগডু এবং পার্শ্ববর্তী রাতেডং শহরের তিনটি চৌকিতে অজ্ঞাত পরিচয়ধারীদের হামলায় ১৩ জন সীমান্তরক্ষী নিহত হয়। এর পর থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষে এ পর্যন্ত মোট ৪৩ জন নিহত হয়েছে।
সীমান্তরক্ষীদের ওপর হামলাকারীদের ধরার জন্য অভিযানের নামে মিয়ানমারের পুলিশ, সেনাবাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী মুংগডু, রাতেডং এবং বুথিডং এলাকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের গ্রামগুলোতে অভিযান চালাচ্ছে।
সেখানে অভিযানের কারণে চার শতাধিক স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সড়কগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে। আকাশে হেলিকপ্টারের টহল দিতেও দেখা গেছে। আতংকে লোকজন ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করেছে।
নিরাপত্তা বাহিনী ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি সন্দেহভাজন হামলাকারী আখ্যা দিয়ে বহু রোহিঙ্গাকে গ্রেফতার করছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে ৫৭টি মুসলিম দেশের জোট ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা-ওআইসিও রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ করেছে।
সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলেছে, রাখাইন প্রদেশে নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করছে, তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি অবাধে ধরপাকড়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
অন্যদিকে রাখাইন প্রদেশের চলমান পরিস্থিতিকে গণহত্যা পরিস্থিতির ‘নতুন পর্যায়’ আখ্যা দিয়েছেন লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইন্টারন্যাশনাল স্টেট ক্রাইম ইনিশিয়েটিভ’-আইএসসিআই।
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমসের এক এক প্রতিবেদনে আইএসসিআইএ’র গবেষকদের বরাতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গাদের বিচারবহির্ভূত হত্যা, অবাধে গ্রেফতার এবং তাদের ঘরে ঘরে তল্লাশি অভিযান বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি এবং দেশের অন্য প্রদেশগুলো থেকে ভয়াবহভাবে বিচ্ছিন্ন থাকায় মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নিবিড়ভাবে পরিচালিত নিপীড়নের তথ্যগুলো যাচাই করা কঠিন বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
আইএসসিআইয়ের পরিচালক এবং কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক পেনি গ্রিন বলেছেন, রাখাইন প্রদেশটি তথ্যহীনতার এক ‘ব্লাকহোল’ এবং সেখানে ব্যাপকভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ চালু আছে। ফলে সেখানে মানবাধিকার লংঘনের অভযোগগুলো স্বাধীনভাবে তদন্ত করা কঠিন বা অসম্ভব।
তিনি বলেন, তারপরেও ২০১৫ সালেই আমরা সতর্ক করেছিলাম যে, আমরা গণহত্যা প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ের অনেক ঘটনা ঘটতে দেখেছি।
র্ব্তমানে ব্যাপকহারে সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি, চলাফেরা নিয়ন্ত্রণের অতিরিক্ত বিধিনিষেধ এবং খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা সীমিত করা হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে খবর পাওয়ার বিষয়টি জানান অধ্যাপক পেনি গ্রিন।
তিনি বলেন, রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের সর্বশেষ যে সব ঘটনা ঘটছে, তাকে তাকে আমরা গণহত্যার একটি পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করছি।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘের ভাষায়, রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষজন বিশ্বের সবচাইতে নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর একটি যারা পৃথিবীর কোনো দেশের নাগরিক নয়।
গত কয়েক শতাব্দী ধরে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের বাস। দেশটি রোহিঙ্গাদের তার নাগরিক মনে করে না। বরং মিয়ানমার মনে, করে তাদের আদি আবাস বাংলাদেশ। এমনকি রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহারেও দেশটির সরকারের আপত্তি রয়েছে।
রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে বৌদ্ধদের হাতে নির্যাতনের শিকার বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সহিংসতার মুখে পালিয়ে সীমান্ত পার হয়ে তাদের অনেকেই বাংলাদেশেও প্রবেশ করেছে।
বাংলাদেশে কক্সবাজার এলাকাতেই তাদের একটা বড় অংশ বাস করেন। এছাড়া চট্টগ্রাম, বান্দরবান, খাগড়াছড়িতেও কিছু রোহিঙ্গা বসবাস করছেন।
সরকারের রেজিস্টার্ড ক্যাম্পগুলোতে ৩৩ হাজারের মতো রোহিঙ্গা বাস করে। কিন্তু বলা হয়- বাংলাদেশে তাদের মোট সংখ্যা পাঁচ লাখের মতো। সুত্র: যুগান্তর
পাঠকের মতামত